একসময় উসমানীয় সম্রাজ্যের রাজধানী হলেও ইস্তানবুল এখন আর তুরস্কের রাজধানী নয়, তারপরেও ইতিহাস ঐতিহ্য এবং স্থাপত্যশিল্পে বেশ নামডাক রয়েছে এই শহরের, ইউরোপ আর এশিয়ার এই সংযোগস্থলে খুব সম্ভবত ইউরোপেরই আধিপত্য বেশি।
নতুন এয়ারপোর্টের রানওয়ে ছুঁয়ে যখন বিমান টার্মিনালে পৌছুলো তখন প্রায় মধ্য দুপুর। মধ্যপ্রাচ্যের মত তুরস্কও বিমান পরিবন ব্যবসায় মনোযোগ দিয়েছে সেটা তাদের রানওয়ের বিশাল আকার দেখলেই বোধগম্য হয়, বিমানে পাশের যাত্রী ছিলেন জাতিসংঘের সোমালিয়া মিশনে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত এক বাংলাদেশি। তিনি প্রায়ই এই বিমানে চড়েন এবং সুযোগ পেলেই ইস্তানবুলে দু-একদিন সময় কাটিয়ে যান। তিনি অবশ্য এই বিমানের খুব একটা সুনাম করলেন না।

বিমান থেকে নেমে অভিবাসন প্রক্রিয়া পর্যন্ত পৌছুতে মিনিট সাতেক সময় লাগলেও অভিবাসন প্রক্রিয়া শেষ করতে ত্রিশ সেকেন্ডও লাগল না যদিও প্রচুর সংখ্যক যাত্রী অপেক্ষমাণ ছিল। অসংখ্য পর্যটকের আগমন দেখে খুব সহজেই এই দেশের ভ্রমণের নিরাপত্তা এবং কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার পরিচয় পাওয়া যায় আর বারবারই নিজ দেশের অবস্থা চিন্তা করছিলাম, কত বছর পর আমরা পর্যটকদের জন্য তৈরি হব?

অভিবাসন প্রক্রিয়া শেষ করে মালপত্র বিতরণকারি বলয়ের কাছে পৌঁছুতেই নিজের মালামাল দেখে বেশ ভাল লাগল,এই মালামাল ব্যবস্থাপনায় পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশই হিমশিম খায়। বিমানবন্দরে আগে থেকেই আমার অপেক্ষায় একজন দাঁড়িয়ে ছিল যে আমাকে আমার হোটেলে যাবার গাড়িতে উঠিয়ে দিবে। থাকার ব্যবস্থা প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার দক্ষিণে। গন্তব্যের দিকে বিলাসবহুল গাড়ি ছুটে চলল, প্রায় ঘন্টাখানেক পরে বসফরাসের তীরে আলিশান এক হোটেলে পৌছুলাম।

উত্তরের কৃষ্ণ সাগর আর দক্ষিণের মারমারা সাগরকে সংযোগ করেছে এই বসফরাস প্রণালী, ছোটবেলায় সম্ভবত ফসফরাস বলতাম সাধারণ জ্ঞানের বইয়ে। এই জলপ্রণালীর পুবে এশিয়া মহাদেশ আর পশ্চিমে ইউরোপ। এশিয়ার সংস্কৃতির অভাব কিছুটা তো চোখে পড়বেই। জলপথে মালামাল পরিবহনে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ এক পথ এই প্রণালী।
হোটেলের গুছানো কক্ষ থেকে বসফরাসের বড় অংশটাই চোখে পড়ে, লাগোয়া বারান্দা থেকে অবশ্য পোতাশ্রয়ের কিছু অংশ দেখা যায়, সব মিলিয়ে একেবারে নয়নাভিরাম দৃশ্য।
গুছানো ও আধুনিক কক্ষ হলেও চা-কফির ব্যাবস্থা নেই, কিছুটা হতাশার এবং এরকম একটি আবাসনের জন্য বেশ বেমানান। হাত মুখে কিছু ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দিয়ে আশ পাশটা দেখতে বের হলাম, সাথে একটু চা পানের ইচ্ছা। যে অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে এখানে আসা সেটি সন্ধ্যা নাগাদ শুরু হবে। ‘জেট ল্যাগ’ কে ল্যাং মেরে বসফরাসের তীর ঘেঁষে হাঁটা শুরু করলাম। উদ্দেশ্য আশপাশটা ভাল করে দেখা আর পেটে কিছু স্বল্পমূল্যের দানা পানি দেয়া, ঐ কেতাদুরস্ত হোটেলের খাদ্য এই গরিবি জিহ্বায় ঠিক সইবে না। তবে কিছুটা নিরাশ হয়েই পাশের এক দোকান থেকে গরুর গোশত মুড়ানো রুটি খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতে হল।

নতুন শহরে আসলে মুঠোফোন সংযোগ ছাড়া বেশিদূর ঘুরে বেড়ানো দুঃসাধ্য এক কাজ, তার উপর সে শহরের বাসিন্দারা যদি আপনার ভাষায় বা প্রচলিত ইংরেজিতে কথা না বলে তাহলে তো আর এক বিপদ। এসব ভেবেই খুঁজে পেতে এক দোকানে ঢু মারলাম, তাদের নাম ‘টার্ক টেলিকম’, দোকানে গ্রাহকের চেয়ে সেবা দাতার সংখ্যা বেশি তারপরেও তারা হিমশিম খাচ্ছে। মাত্র দুজন গ্রাহক অপেক্ষমাণ থাকার পরেও আমার ডাক এল যেন অনন্তকাল পর।
নতুন সিম চাই এই কথা ইংরেজিতে দুচারবার বলার পর আবিষ্কার করলাম টেবিলের ওপাশে বসে থাকা মেয়েটি ঠিক ইংরেজি জানে না, অগত্যা সে নিজে থেকেই গুগল এর অনুবাদক ব্যবহার করে আমার প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করল এবং প্রায় আধ ঘণ্টার চেষ্টা বিফলে গেল আমার ‘স্থায়ী বসবাসের অনুমতিপত্র’ নেই বলে, তার উপরের কর্তৃপক্ষ এসে কিছুক্ষণ দুঃখ প্রকাশ করল, অনেকক্ষণ বসে থেকে কাজ হয়নি বলে কিছুটা বিরক্তি নিয়েই বের হয়ে এলাম।
বসফরাসের তীর ঘেঁষে আরো কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে, ঠাণ্ডা বাতাস গায়ে মাখিয়ে ফিরে গেলাম। বসফরাস নয়নাভিরাম হলেও তুরস্কের অর্থনীতিতে এর গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রয়েছে। এর দুপাশের জনপদে সম্ভবত বসফরাসের সৌন্দর্য অনেকটাই বিস্তৃত হয়েছে।
এখানে যে উদ্দেশ্যে আসা সে আয়োজনের সাথে সম্পৃক্ত বলে কাজকর্মের ব্যস্ততা শুরু হল, সান্ধ্যকালীন সভা, পরিচয় এবং লম্বা সময় ধরে রাতের খাবার গ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রথম দিনের আগমনী কার্যক্রম সম্পন্ন হল। এখানে অনেকক্ষণ সময় ধরে খাবার না খেলে ঠিক সেটা জমে না যেটা পরে বুঝতে পেরেছিলাম।

দুদিনের নির্ঘুম ভ্রমণ ও যাবতীয় কার্যক্রম শেষে রাতের বসফরাস দেখতে একটুও ক্লান্ত লাগল না। দুপাশে অসংখ্য সোডিয়াম বাতি আর পানিতে প্রতিবিম্ব দেখতে একটু ঘোরলাগার মতই। সেদিনের মত সব সমাপ্ত করে গভীর ঘুম দিলাম…
বাকিটা পরের কিস্তিতে …
