
খুব ছোটবেলায় সকালে ক্লাসে যাওয়ার সময় আব্বু বাটার বন কিনে দিত টিফিনের জন্য। ২ টাকা দাম ছিল তখন। প্রায়ই বায়না ধরতাম ৬ টাকা দামের বার্গার কিনে দেয়ার জন্য। অসুস্থ থাকলেই কেবল বায়না পূরণ হতো। আমাকে ছোটবেলা থেকে এখন পর্যন্ত ফাস্ট-ফুড খেতে নিরুতসাহিত করে আব্বু।
বিকেলে ঘুম থেকে উঠলে প্রায়ই আমাকে নিয়ে হাঁটতে বের হত আব্বু। আর একটা লেকের পাড়ে এক চটপটিওয়ালার কাছ থেকে ৫ টাকার চটপটি কিনে খাওয়াত। সেই চটপটিওয়ালার দোকানের কাছাকাছি গেলেই বাতাবি লেবুর একটা অসাধারন ঘ্রাণ পাওয়া যেত। সেই লেবুর ঘ্রাণ যেন এখনো পাই।
তারো আগে প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে পুকুরে সাঁতার শেখাত আব্বু। আমার কেন জানি সাঁতার শিখতে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল। আব্বু কী যে ধমক দিত । আর যখন শিখে গেলাম তারপর স্কুল থেকে এসেই অবধারিতভাবে পুকুরে ঘন্টা দুয়েক সময় কাটাতাম একা একা।
আমার সাইকেল চালানো শেখাটাও আব্বুর হাত ধরে। আম্মুর জন্যে সাইকেল কিনে দিতে পারে নি কিন্তু ঘন্টা প্রতি ৫-৬ টাকার বিনিময়ে ভাড়া নিয়ে প্রায়ই ছুটির দিন সকালে সাইকেল চালানো শিখাতো।
তারো আগে বাসার সামনে আব্বুর শখের বাগানে আমাকে নিয়ে কাজ করতেন। বান্দরবনে যখন ছিলাম আমরা তখন একেবারেই শিশু বাচ্চা ছিলাম আমি। তারপরেও অল্প কিছু স্মৃতি মনে পড়ে । আগুন লাগলে এক হাতে আমাদের সবাইকে ঝাপটে ধরে আর এক হাতে কুরআন শরিফ আর কিছু দলিল দস্তাবেজ নিয়ে দৌড়ে বের হতেন। সেখানে কোথায় যেন একটা শশার ক্ষেত ছিল আমাদের। আব্বুর শখের কৃষি কাজ। শশা আর ডাবের প্রতি আব্বুর এখনো একটা তীব্র পছন্দ কাজ করে।
সরকারী চাকরির জন্য আব্বুকে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে পুরো বাংলাদেশ। সৌখিন হওয়াটা সম্ভবত আব্বুর কাছ থেকেই শেখা। বাসার সব ফার্নিচার সেগুন কাঠের বানানো। সেই আমলে ফটোগ্রাফী শেখা, হরিন পোষা – কত কী ! এখনো ঠিক মনে পড়ে সেই আমলে বিটিভি’র সাদা কালো স্ক্রীনে আলিফ লায়লা দেখার সময় আব্বু কী যত্ন করে দুধ-ভাত খাওয়াতো । আর এর পরে একটু বড় হয়ে যখন বিকাল বেলা খেলা-ধুলা করতাম তখন সন্ধ্যায় আমার জন্যে স্পেশাল মগে হরলিক্স বানিয়ে রাখত।
ক্লাস নাইনে একবার আমার আর আমার বড় বোনের খুব বাজে ধরনের টাইফয়েড হল। খুবই বাজে অবস্থা ছিল । তখন আব্বুর চোখের দিকে তাকানো যেত না, মনে হত এক্ষণি কেঁদে ফেলবে। ছোট বেলা থেকে আমার এজমা’র বিশাল সমস্যা। কত ডাক্তার কত ঔষধ কত টেস্ট – সব আব্বুর হাতে ধরে। আব্বু ডাক্তার খুব একটা পছন্দ করেন না। তারপরেও নিয়ে যেতেন। তখন আমার ইনহেলার ছিল না। যখন খুব শ্বাস কষ্ট হত তখন আব্বু বুকে পিঠে ম্যাসাজ করে দিতেন। ম্যাসাজের কারনে খুব একটা কমত না কিন্তু তারপরেও মনে হয় কিছুটা আরাম হত।
ছোটবেলায় আম্মুর অনেক জোরাজুরিতে একজন হুজুর রাখা হয়েছিল আমাকে ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য। কিন্তু কোন হুজুরই আব্বুর জন্যে টিকত না। কেন জানি এখনো আব্বু কিছু বিশেষ হুজুর শ্রেনীর মানুষকে ঠিক পছন্দ করেন না। অথচ আব্বুর মত ধর্মভীরু মানুষ আমি কমই দেখেছি। নৈতিক শিক্ষাগুলোর বেশিরভাগই আব্বুর অবদান।
প্রাইমারী স্কুলে সবাই যখন বৃত্তি কোচিং নিয়ে ব্যস্ত আমি তখন স্কাউটিং নিয়ে ব্যস্ত। আব্বুর সমর্থন না থাকলে কখনোই হয়ত সেটা সম্ভব হত না। রচনা প্রতিযোগিতায় প্রায়ই আব্বু কিছু লাইন লিখে দিতেন। প্রতিবারই প্রথম-দ্বিতীয় হতাম । ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পাওয়ার পর আব্বুর সেই হাসিমুখটা এখনো চোখের সামনে ভাসে। এর পর আমার সব সাফল্যে কখনোই আর আমার সামনে অতটা উচ্ছ্বাস দেখাননি।
আমার জীবনে আমি যত রকমের ভলান্টিয়ার ওয়ার্ক করেছি, যত ধরনের লম্ফ-ঝম্ফ দিয়েছি তার সবগুলোতেই আব্বু একেবারে ছায়ার মত জড়িয়ে আছে। কিন্তু কখনোই বুঝতে দেন না যে আমার ইনিশিয়েটিভ গুলা নিয়ে তিনি সচেতন।
প্রতি ঈদের সময় আম্মুর বাধা সত্ত্বেও আমাকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যায় আব্বু। খুব সম্ভবত সে কারনেই গ্রামের প্রতি আর গ্রামের সাধারন মানুষগুলোর প্রতি একটা অসাধারন টান অনুভব করি। নাড়ির টানটা কখনোই অনুভব করতাম না যদি না এভাবে প্রতি বছর দু’বার গ্রামে যাওয়া হত।
ঠিক একইভাবে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতৃবৃন্দ এনাদের প্রতিও একটা শ্রদ্ধা তৈরি হয়েছে আব্বুর কারনে।
কী সৌভাগ্যবান আমি, কী অসাধারন শৈশব আমার, কী অদ্ভুত বন্ধুত্ব ! ধন্যবাদ আব্বু। 🙂
#নস্টালজিক #ছোটবেলার_ডায়েরী #আব্বু
পুনশ্চঃ তিন ভাই-বোনের মধ্যে আমিই সবচেয়ে কম আদর পেয়েছি আব্বুর। আমার দুই বোন আমার চেয়েও বেশি সৌভাগ্যবতী।
পুনঃপুনশ্চঃ আম্মুর গল্প আর একদিন হবে। যদিও সেটা শাসনের গল্পই বেশি হবে – তারপরেও অসাধারণ এক জননীর কথা লিখব না তা কেমন করে হয় ?