Memoir

আমার ঈদ বিলাস

ছোটবেলা থেকেই ঈদ বেশ আনন্দের এক নাম, অন্য সবার মতই। বড় হওয়ার সাথে সাথে ঈদের অর্থ, আনন্দ আর উদযাপন সবই পরিবর্তন হয়েছে। তবে ঈদ এখনো এক রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতা। গত দুই বছরের অধিক সময় ধরে ডেঙ্গু, করোনা নানা কারনে সেই অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত, তাই একটু স্মৃতিচারন করি।

আমরা যেহেতু বৈশ্বিক চাঁদ অনুসরন করি সেহেতু ঈদ সাধারনত আমাদের জন্য একদিন বা দুইদিন আগেই আসে। সাধারনত ঊনত্রিশতম রোযার দিন আমি আর আব্বু তল্পি-তল্পা গুছায়ে গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। আব্বু যেহেতু মোটামুটি বিকালের অনুষ্ঠানে দুপুরে গিয়ে বসে থাকার মানুষ তাই স্বভাবতই খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে সেই যাত্রা শুরু হয়।

প্রায় প্রতি ঈদেই আমরা চাচার একটা ঝরঝরে নোয়াহ গাড়িতে করে গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। সেই যাত্রাটা বেশ আনন্দদায়ক। এমনকি মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার হওয়ার আগে যাত্রাবাড়ি থেকে কাচপুর সেতু পার হতে ঘন্টার পর ঘন্টা জ্যামে বসে থাকতে হত। সেই বসে থাকাটাও যেন ঈদ যাত্রার অংশ হয়ে যেত। চাচা যেহেতু ভীষণ আমুদে মানুষ তাই গাড়িতে প্রচুর গল্প হত, সেই গল্পে বুশ থেকে গ্রামের চায়ের দোকানদার পর্যন্ত প্রায় সকলের উল্লেখ থাকত। বিগত কয়েক বছর অবশ্য ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন সড়ক হবার কারনে এই যাত্রাপথ বেশ অনেকখানি সংক্ষেপিত হয়ে গেছে। তারপরেও কুমিল্লার বিশ্বরোড থেকে একেবারে বাড়ি পর্যন্ত অবারিত বাংলার রূপ মন্ত্রমুগ্ধের মত দেখতে দেখতে আর কখনো কখনো গান শুনতে শুনতে ভ্রমণ করা অনেক আনন্দের।

বাবা চাচারা তাদের সেই পুরোনো টিনের ঘরে গিয়ে মনে হয় যেন নিজেদের সুলেমানী রাজত্ব ফিরে পায়। তাদের হাঁক ডাকে মোটামুটি পুরো গ্রামে হইচই পড়ে যায়। অনেক আগে যখন দাদু বেঁচে ছিলেন তখন আনন্দের মাত্রা, গ্রামের পরিবেশ আরো প্রাণবন্ত ছিল। আমি তখন খুব ছোট ছিলাম কিন্তু তারপরেও মনে আছে কোন এক চাঁদ রাতে উঠোনে শিতল পাটি পেতে আকাশের দিকে তাকিয়ে লম্বা এক আড্ডা দিয়েছিলাম। প্রায়ই এরকম আয়োজন হতো, ফুপুরা আসলে আরো অনেক আনন্দ হতো। গ্রামে এখনো গেলে অনেক দূরের আত্মীয় স্বজনরাও কিভাবে যেন খবর পেয়ে চলে আসেন। পুরো রাতে ঘুম প্রায় হয় না বললেই চলে।

আমার আর চাচার দুজনেরই প্রচণ্ড চায়ের নেশা। তবে গ্রামে চায়ের প্রচলন অতটা প্রকট নয়। আমি আর চাচা বেশ অনেকটা চালাকি করে চা পাই। আমার যখন চায়ের ইচ্ছা জাগে তখন আমি গিয়ে অন্দর মহলে বলি চাচাকে চা দেয়া হয়েছে কিনা, উনি চা খেতে চাচ্ছেন ইত্যাদি আবার চাচাও একই রকম টেকনিক এপ্লাই করেন আর সেই কারনে আমরা দুজনেই চা পেয়ে যাই। আব্বু অবশ্য চা ছুঁয়েও দেখেন না গত তিন চার দশক!

সেই চাচা গত প্রায় চল্লিশ দিন যাবত হাসপাতালে করোনার সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। দেশের বেশ কয়েকটা সংকট সময়ে উনি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তার সমাধান না হলে বেশ সংঘাতের সম্ভাবনা ছিল। বাংলাদেশ থেকে পবিত্র কা’বা শরীফের ভেতর প্রবেশের বিরল সৌভাগ্য যে দুএকজনের হয়েছে তার মধ্যে উনি একজন। তিনি আইসিইউতে শুয়ে থেকেও গ্রামে তারই তৈরি করা হাসপাতালের খোঁজ নিচ্ছিলেন। আব্বুও ডিসেম্বরে করোনাতেই হাসপাতালে শুয়ে গ্রামের বিভিন্ন কাজের খোজ নিচ্ছিলেন। আমার বাবা-চাচারা যে বুড়ো বয়সে এসে এসব দাতব্য কাজ করছেন তা না, তারা তাদের কর্মজীবনের শুরু থেকেই এই অজ-পাড়াগায়ে নানান উন্নয়নমুখী কাজ করেছেন কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছাড়াই। আল্লাহ তাঁদের সুস্থতা দান করুন।

রাত একটু গাঢ় হলেই শুরু হয় চাঁদের খোঁজ। কয়েক দশক আগে ভাঙ্গা এক রেডিও দিয়ে সেই চাঁদের খোঁজ চলত, সেই আর এক রোমাঞ্চ! সাহরি খাওয়া হবে না হবে না এই নিয়ে জল্পনা কল্পনা চলত। এখন তো চাঁদ ওঠার আগেই খবর পাওয়া যায় যে কোন এলাকায় চাঁদ দেখা যাবে ঠিক যেমন এখন আর কেউ লাঠির ছায়া দেখে নামায পড়ে না।

বিকেলের দিকে মিলাদের আয়োজন হতো গ্রামে। আমাদের বাড়ির পাশে পুরোনো আমলের একটা কাচারি ঘর নামে প্রায় পরিত্যাক্ত ঘর আছে, সেখানে এই আয়োজন। এই কাচারি ঘরের সংস্কৃতিটা বেশ পুরোনো, বনেদি বাড়ি ঘরে আগে এরকম বৈঠকখানা থাকত সেখান থেকেই এই কাচারি ঘরের আচার।

ঈদের চাঁদের খবর পেলে আগে অনেক বাজি-পটকা ফুটানো হতো কিন্তু এখন গ্রামের বেশিরভাগ ছেলে পেলে রা বড় হলে বিদেশে অথবা রাজধানীতে পাড়ি দেয়। তাই সেই আমেজে বেশ অনেকটা ভাটা পড়েছে।

গ্রামের সেই অল্প কয়েকবেলা থাকার আর একটা বড় অনুসঙ্গ হচ্ছে খাবার দাবার। লাকড়ির চুলায় রান্না করা তাজা সবজি, মাছ আর আমার জন্যে আলাদা করে মুরগির মাংস! এই খাবারের স্বাদ একেবারেই আলাদা। বাবা-চাচারা বিভিন্ন রকম মাছ খুঁজে আনেন, বাড়ির সামনেই খাল থেকে বেহালের মাছ তুলে সেই মাছের নানা পদ দিয়ে কয়েকবেলা খাবার খেয়ে যেই তৃপ্তি দেখান সেটা শহরে সারা বছর নানা খাবার খেয়েও মনে হয় পান না।

ঈদের দিন শুরু হয় অন্যরকম এক আয়োজন। আত্মীয় স্বজনে ঘর সরগম হয়ে যায় অথচ ঢাকায় ঈদের দিন যেন অফিসের জমানো কাজ ছাড়া করার আর কিছু থাকে না। ঈদের জামাতের পর গ্রামের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ানো আর একটা নেশা ছিল। গ্রামে দিনের বেলা যেই মায়া রাতে যেন অন্যরকম এক আবহ। শীত-গ্রীষ্ম বর্ষা ভিন্ন ঋতুতে ভিন্ন আবহ।

গ্রামে স্যানিটেশনের অবস্থা খুব একটা সুবিধের নয়, পানিতেও বেশ সমস্যা হয়। আমার চাচাত ভাইরা যেতে চান না। আমিও হয়ত চাইতাম না ছোটবেলায় তবে যতই অভ্যস্ত হয়েছি ততই এই নেশা বেড়েছে। গ্রামে না গেলে হয়ত কখনোই উন্নয়নধর্মী কাজে জড়ানোর ইচ্ছে জাগত না। আমাদের এই এলাকাতে মানুষের শিক্ষা স্বাস্থ্য অর্থনীতি এক দুষ্টচক্রে আটকে আছে। মানুষের হতদরিদ্র অবস্থার করুন দশা খুব কাছ থেকে না দেখলে আসলে মানুষের প্রতি ভালবাসা জন্মানোর সুযোগ কম। প্রতিবার এই সফরগুলো আমার জীবনে বেশ প্রভাব ফেলেছে।

ঈদ শেষ হলে নানুর বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া আর একটা অভিজ্ঞতা। দাদু বাড়িতে যেমন অনেক অনেক মানুষের সমাগম নানু বাড়িতে ঠিক তার বিপরীত। বিশাল এক বাড়ি তার আশে পাশে কথা বলার মানুষ খুজে পাওয়াও দূরহ এক বিষয়। কিন্তু তারপরেও সেই বাড়িতে অন্য এক আয়োজন। দাদু বাড়ি থেকে নানু বাড়ি কয়েক কিলোমিটার এর পথ। এই কয়েক কিলোমিটার এই যেই বৈচিত্র্য তা বেশ দৃশ্যমান।

আমাদের এই এলাকায় প্রচুর নারিকেল গাছ বা আব্বুর ভাষায় ডাবের আড়ত আর আব্বুর ডাব হলো অতি প্রিয় পানীয় বা খাদ্যের তালিকায় এক নম্বর। তাই নানু বাড়িতে প্রথম আপ্যায়নে ডাব অবধারিত। অল্প সময় থাকা হলেও আসার সময় মোটামুটি ব্যাগ ভর্তি করে নানু বাড়ির লেবু, নারকেল আর বিভিন্ন মৌসুমী ফল নিয়ে আসা হয়। সুযোগ থাকলে পুকুরের মাছ।

নানু বাড়িতে গেলে নানা-নানুর কবরের কাছে গিয়ে জিয়ারত করা হয়। সেই কবরস্থানের কাছে যেতে বেশ অনেকটা মেঠো পথ মাড়িয়ে যেতে হয়। কবরস্থানের কাছে গেলেই একটা প্রশান্তিকর পরিবেশ পাওয়া যায়। নানা নানু বেঁচে থাকতে ঈদ একেবারেই অন্যরকম ছিল, সেই সময়টা বোধহয় আর কখনো আসবে না।

ফেরার সময়টা বেশি রোমাঞ্চকর থাকে। দুপুরের পর বিকেলের কনে দেখা আলোতে গাড়ি ছুটে চলে ঢাকার পথে। সাথে আবার সেই চাচার আমুদে আড্ডা। আর যেহেতু ঈদ হয়ে যায় আমরা প্রায় সময় গ্রাম-গঞ্জের শেষ রোযায় মানুষের কেনাকাটা, ব্যস্ততা দেখতে দেখতে বাড়ি ফিরি। পথে মাঝে মাঝে থেমে আমরা ভাজা-পোড়া খাই, ইফতারের সময় আসলে প্রতিকী ইফতার করি, চা খাই আর ঢাকায় প্রবেশের সাথে সাথে কোথা থেকে যেন রাজ্যের ব্যস্ততা ফেরত আসে, নিজ বাসায় নিজ কক্ষে এসে আবার শুরু হয় সেই যাপিত জীবন। ঈদ বিলাস আবার বছর ঘুরে আসে। এই কয়েক বছরে ছন্দপতন হয়েছে, আবার কবে সেই ঈদ বিলাসের সুযোগ আসবে সেই প্রতীক্ষায় আছি।

সকলের ঈদ ভাল কাটুক, পৃথিবীটা আবার আগের মত হয়ে যাক। মানুষে মানুষে সৌহার্দ্য সম্প্রিতী বেড়ে যাক এই কামনাই করি।

ঈদ মুবারক

Please follow and like us:
error0
fb-share-icon
Tweet 20
fb-share-icon20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *