Professor Dr. Samir Saha
People and Politics

গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও প্রত্যাশা

অধ্যাপক ডঃ সমীর সাহা’র সাম্প্রতিক সাফল্য এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মাঝে অসাধারন এক অনুপ্রেরণা ছাড়াও একটা চিন্তার খোরাক আছে। যে চিন্তাটা নিয়ে বাংলাদেশকে ভাবতে হবে। এই ভাবনার জায়গাটা তৈরি করার জন্যে অনেকদিন থেকেই কাজ করছি। জাতীয় সংসদে পর্যন্ত আলোচনা হয়েছে।

চিন্তার জায়গাটা নিয়ে বলি আজকে। আমাদের দেশে প্রায় প্রত্যেকেই দাবি করেন গবেষণার সুযোগের অভাব। একই সাথে একটা তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন অনেকে। এই বিষয় নিয়ে হয়ত অনেক বিতর্কের সুযোগ রয়েছে তবে এদেশে যে মানসম্পন্ন এবং দেশের সমস্যা সমাধানে টেকসই গবেষণা ও গবেষণার ফলাফলের ব্যবহার একেবারে নগন্য পর্যায়ে তা চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায়। সামাজিক বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণা হলেও তা মূলত মাঠ পর্যায়ের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সামগ্রিক অর্থে উন্নয়ন সংস্থা এবং সরকারের কিছু সংস্থার কল্যাণে গবেষণা ও গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্তের ব্যবহার অতটা অপ্রতুল নয় যতটা প্রযুক্তিগত গবেষণাক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়।

এবার আসি অধ্যাপক ডঃ সমীর সাহা এবং তার গল্পে চিন্তার খোরাক টা কি? তার সাথে উপরের কথাবার্তারই বা কি সম্পর্ক! অধ্যাপক ডঃ সমীর সাহা ঢাকা শিশু হাসপাতাল এর অনুজীব বিভাগের অধ্যাপক এবং বর্তমান বিভাগীয় প্রধান। ঢাকা শিশু হাসপাতাল হল বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ শিশু হাসপাতাল এবং টারসিয়ার পর্যায়ে সরকারি হাসপাতাল। এখানে প্রায় ৬৫০ টি বেড রয়েছে এবং গড় রোগীর সংখ্যা এর চেয়ে বেশি অন্য যেকোন সরকারি হাসপাতালের মতই। তো এত বড় একটি হাসপাতালের অনুজীব বিভাগের মত বিভাগের কার্যক্রম আসলে কি হওয়া উচিত? এখানে দুটি উত্তর আছে। কেউ বলবে সাধারন চিকিৎসাসেবার মান বাড়ানো আবার কেউ বলবে গবেষণা করা। যেকোন বিশেষায়িত বিভাগের প্রধান কাজই হওয়া উচিত গবেষণা কিন্তু সাধারনত সরকারি প্রতিষ্ঠানের বেলায় এ প্রসঙ্গ আসলে প্রায় সকলেই এক বাক্যে বলেন – এত রোগীর চাপ বা সুযোগের অভাব! সুতরাং, সচারচর এ ধরনের বিভাগ থেকে গবেষণা আশা করা হয় না, কালে ভদ্রে কিছু গবেষণা হলেও তা জাতীয় পর্যায়ে সাধারনত প্রচারিত হয় না। এর অনেক অনেক কারন রয়েছে, সেগুলো নিয়ে লিখলে মোটামুটি তিন খণ্ডের বই লেখা যাবে। তবে একেবারে মূল কারন হল আমাদের দেশে সার্বিকভাবেই গবেষণা প্রাধান্য পায় না, কেন পায় না সেটির মূল কারন বললে আমার চাকরি থাকবে না ধরনের একটা অবস্থা হওয়ার সুযোগ আছে। আপাতত সেই সাহস নেই!

যাহোক এই ঘটনাগুলো সবারই কম বেশি জানা আছে। যে বিষয়টি বলার জন্যে এই প্রসঙ্গের অবতারনা করেছি বা যে চিন্তার খোরাক যোগাতে চেয়েছি সেটি বলি এবার। এতসব সংকটের মাঝেও কিন্তু অধ্যাপক সমীর সাহা গবেষণা করে দেখিয়েছেন এবং যে অভাবের কারনে গবেষণা হয় না বলে মানুষ চিৎকার করে তিনি নিজ উদ্যোগে সে ল্যাবও স্থাপন করেছেন। কিন্তু তাকে এইসকল কার্যক্রমের জন্য ‘চাইল্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সংস্থা স্থাপন করে নিতে হয়েছে। এখানেই মূল চিন্তার জায়গা বলে আমি মনে করি। অধ্যাপক সমীর সাহা প্রমাণ করেছে দেশসেবা করতে হলে ‘সুযোগ নেই’ এই কথার তেমন কোন ভিত্তি নেই। আমিও ব্যক্তিগতভাবে তাই মনে করি। এখানে শুধুই সদিচ্ছা প্রয়োজন যেটি অধ্যাপক সমীর সাহা’র আছে।

প্রশ্ন হচ্ছে কেন সমীর সাহাকে এরকম একটি সংস্থা তৈরি করে তার মাধ্যমে গবেষণা বা সেবা কার্যক্রম করতে হবে? তিনি তো সরকারের সর্ববৃহৎ হাসপাতালেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তি। তার বিশেষায়িত বিভাগ থেকেই তো এই কার্যক্রমগুলো পরিচালিত হওয়ার কথা। আমি ঠিক অধ্যাপক সমীর সাহার এই বিশেষ ঘটনার কথা বলতে পারব না তবে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুবাদে মোটামুটি চিত্রটি অনুমান করতে পারি। আজ সংক্ষেপে মূল বিষয়টি বলি, পরে হয়ত আর একটি বিস্তারিত লেখা যাবে।

এসব ক্ষেত্রে প্রধান যে সমস্যাটি কাজ করে সেটি পূর্বেই কিছুটা উল্লেখ করেছি যে এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণা প্রাধান্য পায় না সাধারনত। এমনও সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে যার নামটিই গবেষণা প্রতিষ্ঠান অথচ সেখানে বছরের পর বছর গবেষণা হয় না। যাহোক, এ ধরনের গবেষকরা একাডেমিয়ার বাহিরে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে বাংলাদেশে গবেষণা করতে চান না প্রধানত তিনটি কারনে। প্রথম কারনটি হচ্ছে গবেষণা সত্ত্ব, গবেষণা শেষে (যদি গবেষণা হয় আর তা শেষের মুখ দেখে আরকি) দেখা যায় মূল গবেষক তিনি তেমন একটা প্রাধান্য পান না, প্রতিষ্ঠান প্রধান শেষের ফলাফল নিয়ে তিনি সেই গবেষণার জন্য কত চেস্টা করেছেন সেটিই মূখ্য হয়ে দাঁড়ায়, অর্থাৎ এখানে গবেষকের ইনসিকিওরিটি কাজ করে, সাথে পেটেন্টসহ আরো কিছু বিষয় তো রয়েছে যা গবেষকদের জন্য মৌলিক বিষয়। তারপরেও কেউ কেউ তো প্রতিষ্ঠানকে ভালবেসেও করতে পারেন, না তাও হবে না কারন দুঃখজনক হলেও সত্য এখানে টানাটানির একটা বিষয় রয়েছে। যাহোক, দ্বিতীয় যে বিষয়টি রয়েছে সেটি হল স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তা। একজন গবেষকের মূল অনুপ্রেরণা হল তার নিজস্ব জ্ঞানলব্ধ অনুমানকে বাস্তব প্রমাণ করা, এখানে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে সেই স্বাধীনতা অনেকাংশেই ক্ষুন্ন হয় এবং ভবিষ্যতে একটি গবেষণা চালু থাকবে কিনা সেটি নির্ভর করে গবেষক প্রতিষ্ঠান প্রধানের সাথে কতটা ভাল সম্পর্ক রাখছেন। একই সাথে নানা জবাবদিহিতা তো থাকেই। (এটি অবশ্য পৃথিবীব্যপীই একটি সমস্যা, আলাদা করে আমাদের দেশের সমস্যা বলাটা ঠিক না)। তিন নম্বর যে বিষয়টি কাজ করে সেটি হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। এটি মোটামুটি সবাইই কমবেশি জানি। এর বাহিরেও আরো কিছু সমস্যা আছে তবে সেগুলো আপাতত বলছি না।তো, এই কয়েকটি কারনেই একজন গবেষক ও সদিচ্ছুক ব্যক্তি নিজস্ব একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করতে বেশি নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সেটি অনেকাংশেই একটি নির্দোষ একটি বিষয়। কিন্তু সেক্ষেত্রে আসলে মূল প্রতিষ্ঠানটি বঞ্চিত হয় এবং বেশ কিছু দ্বান্দিক বিষয় সামনে চলে আসে যেগুলো সাধারনত আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অতটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না কিন্তু কিছুটা কূটনৈতিক হলেও সাম্প্রতিক একইরকম ঘটনায় হার্ভার্ড এর অধ্যাপককে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গ্রেপ্তার করেছে।

তবে এতকিছুর মধ্যেও যে আমাদের দেশে গবেষণা উদ্ভাবন এবং প্রয়োগ হয় না তা কিন্তু না। যেমন শ্যাম্পুর বোতল দিয়ে কিভাবে নিউমোনিয়ার চিকিৎসায় সেবা দেয়া যায়, প্রসূতি মায়ের প্রসবে উদ্ভাবন এরকম নানা অনুপ্রেরণার গল্প কিন্তু আছে। এমপ্যাথেটিক ব্যক্তিরা সাধারনত কোন কিছুর পরোয়া করেন না, এটিও তোলা থাক আর একটি আলোচনার জন্য। দেশে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে গবেষণার সবচেয়ে ভাল উদাহরণ পাটের জিনোম সিকোয়েন্স (তবে তার ফলাফলে কি লাভ হয়েছে তা এখনো পরিষ্কার না), পাটের পলিথিন আবিষ্কার (সেটি বানিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়েছিল কিন্তু জনপ্রিয়করণে সেরকম কোন উদ্যোগ চোখে পড়ে নি, কিন্তু সেই উদ্ভাবককে সরকারি একটি সংস্থা কিভাবে ডিল করেছিল তা নিজ চোখে দেখার সুযোগ হয়েছিল), IRRI এর বেশ কিছু সাফল্য আছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাব্বানী স্যার অবসরের পরেও তাঁর নিজের বিভাগ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা চালু রেখেছেন (তাকেও একটি সংস্থা আসলে নাজেহাল করেছিল বলেই মনে পড়ে)।

তবে সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আমি যতজন সমীর সাহাকে চিনি, যতজন কর্মতৎপর গবেষককে চিনি (সংখ্যায় কিন্তু কম না) যাদেরকে আমরা ‘চ্যাম্পিয়ন’ বলি তারা প্রত্যেকেই নিজের একটি ফাউন্ডেশন খুলে নিয়েছেন এবং তারা প্রত্যেকেই সরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষক। এর চেয়ে দুঃখের আর কিছু নাই, কারন তাদের অর্জন অনেকটাই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান ‘নাগরিক’ এর সাফল্যের মত। এতে কিন্তু ঐ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অনেকভাবে বঞ্চিত হয় আর সবচেয়ে বড় কথা এক্ষেত্রে গবেষকদের একটুও দায়ী করা যাবে না, তারা তাদের সদিচ্ছা বাস্তবায়নে বিকল্প, নিরাপদ ও টেকসই পথ খুঁজে নিয়েছেন। কিন্তু আবার একই সাথে আমি এটাও দেখেছি তারা তাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, রিসোর্স, সময় এবং গবেষণার তথ্য ব্যবহার করেন যা হয়ত গবেষণার নৈতিকতার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

করোনার শুরুর দিকে আমি দেশীয় কিছু গবেষককে সরকারি প্রকল্পে যুক্ত করতে চেয়েছিলাম, এডভোকেসীগু্লো একটু চুপে চাপে করছিলাম। পরে দেখলাম সেই চিরায়ত অনাগ্রহ এবং হুট করে বিদেশী কিছু নাগরিক (যারা বাংলাদেশ বংশোদ্ভূত) তারা জুড়ে গেল। সেটিও খারাপ না, একসময় আমরাই ‘ব্রেইন গেইন’ বলে গলা ফাটিয়েছি। তবে এরকম রূপে সেটি হোক তা চাই নি। আমার মনে আছে বছর দুয়েক আগে বাংলাদেশে প্রবাসী প্রকৌশলীদের নিয়ে একটি সম্মেলন হবে। সম্মেলনের আয়োজক ও কর্তাব্যক্তি বেশ কয়েকবার আমাদের এই ব্রেইন গেইন কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন (দাওয়াত দিয়ে সমাদর করে যুক্ত করেছিলাম আর কি), নিজের পকেটের পয়সা দিয়ে করা সেসকল কার্যক্রমকে একটু স্বীকৃতি চাইলে দেয়া যেত, যাই হোক স্বীকৃতির জন্য তো আর আমরা কাজ করি নি। তো সেই সম্মেলনে আমাদেরকেও একটা পর্যায়ে যুক্ত করতে বাধ্য হলেন সেই আয়োজক এবং একটা সময় সেশন প্ল্যান দেখে একটু কড়া করে মেইল লিখেছিলাম যে প্রতিটা সেশনে অন্তত একজন স্থানীয় গবেষককে রাখা লাগবে, পরে অনেক যোগাড় যন্ত্র করে সেই চেস্টাটা সফল করতে পেরেছিলাম। একটা ছোট উদাহরণ দেই, সেবার সেই সম্মেলনের আমন্ত্রণ পেয়ে স্থানীয় এক শিক্ষাবিদ যিনি বিদেশ সফরে ছিলেন তিনি ২ দিনের নোটিসে তার সফর সংক্ষিপ্ত করে সেই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। যাহোক, এইগল্পগুলোও অন্য কোন দিনের লেখার জন্য তোলা থাক।

কিছু প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের কার্যক্রম দেখলে আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে দেশে গবেষণা কার্যক্রম উৎসাহিত করতে তারা বহুদিন যাবত চ্যারিটি (!) করে যাচ্ছে এবং ব্যপক আগ্রহী। তবে ঘটনা ভিন্ন, তাদের গবেষণার আগ্রহ এবং এই উৎসাহ প্রদানে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই যেটি বুঝতে আমার অনেকটা সময় লেগেছে কিন্তু ততদিনে ভুল প্রতিষ্ঠানের পেছনে শ্রম এবং মেধার (কিছু ক্ষেত্রে অর্থের) ব্যয় হয়ে গেছে। সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর কারনে যারা মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা তারাও সামনে আসতে পারে না, সক্রিয় হতে পারে না। এগুলো নিয়েও হয়ত সামনের দিনগুলোতে লিখতে হবে। আমি সাধারনত ডিজিটাল স্পেসে পলিসি এডভোকেসী করতে চাই না, অফলাইনেই যেহেতু সুযোগ পাই তাই ডিজিটাল স্পেসে আসার প্রয়োজন পড়ত না, তবে এই নতুন সময়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ এসেছে।

Please follow and like us:
error0
fb-share-icon
Tweet 20
fb-share-icon20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *