দোহা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে বিমান উঠে দেখলাম হাতে গোণা কজন যাত্রী। তারপরেও অনেকক্ষণ বোর্ডিং গেট ওপেন ছিল। একসময় হুড়মুড় করে আতঙ্কিত একদল যাত্রী প্রবেশ করল। এই রুটে আমাদের প্রবাসী ভাইদের যাতায়াত পরিচিত ব্যাপার, কিন্তু তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ যেন একটু বেশিই হতদরিদ্রতার ছাপ বহন করছিল।

কিছুক্ষণ বসে থাকতেই বুঝে ফেললাম। ছয়দিন হাজতবাসের পর আমাদের অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তির একাংশ এই দূর প্রবাসে মুখ থুবড়ে পড়েছে। ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষগুলো অভাবের তাড়নায় সব হারিয়ে এবং চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই মরুর দেশে এসেছিল অর্থের সন্ধানে। কাতারের পুলিশ খুব সম্ভবত রাস্তা থেকে শ’খানেক প্রবাসী বাংলাদেশীকে ধরে দিনকয়েক হাজত খাটিয়ে ‘ডিপোর্ট’ করছে। তাদের নিজেদের কথোপকথন থেকে বুঝলাম তাদের পাসপোর্ট এবং শ্রমিক ভিসার আইডি কার্ডও বাতিল করে দিয়েছে।
পেছনে কেউ একজন হাউ-মাউ করে কাঁদছিল। আমার পাশে একজন কাকে যেন ফোন করে বলছিল তার সহকর্মী যে দেশে ফেরত যাচ্ছে সেটি যেন তার মাকে জানানো না হয়, সামনেই একজনের বুকে প্রচণ্ড ব্যাথা, বিমানে কোন এক ফুটবল টিমের চিকিৎসক তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছিলেন।
পুরো বিমান জুড়ে এক হাহাকার, অদ্ভুত এক বিভ্রান্তি। চেষ্টা করছিলাম তাদের পরিস্থিতিতে আমি কি করতাম, ঠিক অনুভব করারো শক্তি পাচ্ছিলাম না। এতটা অসহায়বোধ আগে কখনো করি নি। বাংলাদেশ দূতাবাস, বিমানবন্দরে আমাদের প্রবাসী শ্রমিক ভাইদের এক্সপ্রেস সার্ভিস এইসব বিষয় নিয়ে আগেও লিখেছি, কিন্তু এটা আসলে সরকারের প্রায়োরিটি লিস্টে পড়ে না, তবে রেমিট্যান্স ঠিকই বাড়াতে হবে…
কিছু না পেরে এই ভাইটির একটা ছবি তুলে রেখেছি। তার জামার ছেড়া অংশ দেখে হয়ত গত কিছুদিনের জমিদারির জন্য অনুতাপ করব, আমাদের অর্থনৈতিক উর্ধ্বগামী গ্রাফ দেখব, নিজেদের সত্যিকারের অবস্থান বুঝব। এতটা কষ্ট লাগছিল যে পরে একটা ফাকা সিট খুঁজে সেটায় বসলাম। এখনো সেই দৃশ্যটা ভুলতে পারছি না, নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে, এতটা অসহায় আর কখনো বোধ করি নাই…