২০১৫ সালের শেষের দিকে চাকুরির সুবাদে খুব সৌভাগ্যক্রমে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের গণপরিবহনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ধারনাপত্র ও প্রাথমিক গবেষণাকে কে কাগজে কলমে রূপ দেয়ার কাজটি তৎকালীন মাননীয় মূখ্য সচিব মহোদয়ের মাধ্যমে আমার কাছে আসে। এর কিছুদিন আগে কাছের এক আত্মীয়কে হারিয়েছিলাম এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। সরকারি চাকুরির প্রশিক্ষণ শেষে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে যাবার সময় মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সরকারি এক বাসের ধাক্কায় মৃত্যুবরণ করেন, তার লাশের গাড়ি যখন তার বাসায় পৌছে সেই একই গাড়িতে করে তার অন্তঃসত্বা স্ত্রীকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল সন্তান প্রসবের জন্য। সেই ঘটনার পরপরই কিছু উদ্ভাবনকে সরকারি পর্যায়ে পরিচর্যা করার সুযোগ হয়েছিল।

সেই গবেষণাপত্র তৈরির কাজটি পেয়ে আমি খুব আপ্লুত হয়েছিলাম। সড়ক পরিবহনের সকল তথ্য উপাত্ব রীতিমত ক্যালকুলেটারে হিসেব করে করে মূল সমস্যাটির চিত্র তৈরি করার চেস্টা করছিলাম। আমাদের এই দেশে তথ্যের অভাব মোটামুটি সকল সমস্যার সমাধানের প্রধান ও প্রাথমিক অন্তরায়। এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম ছিল না। তখন খুব সম্ভবত দু-তিন বছরের পুরোনো আর অসম্পূর্ণ তথ্য নিয়ে কাজ করতে হয়েছিল।
ঢাকা মহানগরীতে তখন সরকারি হিসেব মতে প্রায় ১৬৮ টি রুট ছিল যাত প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বাস ও মিনিবাস চলাচলের উল্লেখ ছিল, বাস্তবে সংখ্যাটি আরো বড়। অন্য এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল আবদুল্লাহপুর থেকে শাহবাগ পর্যন্ত মাত্র ১৮.৫ কিমি রাস্তায় তিন হাজারেরও বেশি বাস-মিনিবাস চলাচল করে এবং এখানে ৮৫টিরো অধিক রুটের বাস-মিনিবাসের জন্য বেশ অনেকখানি রাস্তা একীভূত ছিল, মানে কিছু অংশে ৮৫ টি রুটের গাড়িই এসে জড়ো হয়। একটা সমন্বিত ব্যবস্থার অভাবে এই অব্যবস্থাপনা প্রতিবছর অনেক ক্ষয়-ক্ষতির কারন হয়ে দাড়াত। তখন অনেক খেটেখুটে একটা ধারনাপত্র তৈরি করেছিলাম, খুব আশা ছিল সেই ধারনাপত্রটি একসময় সরকারি অগ্রাধিকার প্রকল্পের তালিকায় উপরের দিকে থাকবে। আমার অনেক অনেক কাজের মধ্যে এই কাজটি নিয়ে প্রায়ই খুব শান্তি অনুভব করি, কিন্তু যখন দেখি বাস্তবে অগ্রগতি শূন্যের কাছে তখন প্রচণ্ড হতাশা লাগে।
সম্প্রতি এক আন্তর্জাতিক সংস্থার একটা কাজে সাহায্য করছিলাম, তখন হিসেব করে দেখলাম আমাদের মহানগরীর রাস্তায় ১৭-১৯ রকমের যানবাহন চলাচল করে এবং বুয়েটের এক গবেষণা অনুযায়ী আমরা রাস্তার মাত্র ৩০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারি। পথচারী চলাচলের জন্য আমাদের কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেই, ঢাকার মত একটা দৈত্যাকৃতির শহরের সড়ক ব্যবস্থাপনায় পথচারী, পার্কিং এর নূন্যতম পরিকল্পনা নেই এই সমস্যা সমাধানের জন্য এসাব ইনোভেশন সেন্টার থেকে মাস ছয়েক আগে পথচারী ব্যবস্থাপনা ডিজাইন করার একটা ছোট উদ্যোগ নিয়েছিলাম। খুব একটা আগাতে পারিনি যদিও।
সমসাময়িক ইস্যুতে সোস্যাল মিডিয়াতে রেস্পন্স করতে ইদানিং আর ইচ্ছে করে না, সকল আন্দোলনই ৭-১৫ দিনের মাঝে শেষ হয়ে যায়, উত্তেজনা-আবেগ শেষ কথাবার্তাও শেষ।
আমাদের এই পরিবহন ব্যবস্থা খুব জটিল এক ব্যবস্থা, এখানে অনেক বড় এক ইকোসিস্টেম কাজ করে। আর একই সাথে আমাদের জাতিগত চরম বৈপরীত্য তো আছেই, আন্দোলনে খুব উত্তেজনা থাকলেও আমি ঠিক নিশ্চিত না আগামি দু সপ্তাহ পর কতজন শিক্ষার্থী নিয়ম মেনে ফুট ওভার ব্রীজ ব্যবহার করবে। আর জনগন তো অনেক অনেক দূরের বিষয়। এই জটিল অবস্থা রাতারাতি পরিবর্তন করা হয়ত যাবে না কিন্তু শিক্ষার্থীরা একটু চেস্টা করে পরিবর্তনের শুরুটা শুরু করে দিতে পারে। শেষটা দেখতে পারব কিনা জানি না তবে কারিগরি জায়গা থেকে শুরুর শুরুতে সাধ্যমত ছিলাম, আছি এবং থাকব।
সুন্দর একটা দিনের প্রত্যাশায় রইলাম। সবাই মিলে একদিন এই নতুন করে গড়ার কাজটা শুরু করে দিবে সেই আশা থাকবে।