Emotion Travel Blog

উন্নত জীবনের হাতছানি…

সপ্তাহখানেক আগের কথা। ইউরোপের এক শান্ত শহরের সন্ধ্যায় একান্তে নিরুদ্দেশ ঘোরাঘুরির সৌভাগ্য হয়েছিল এক প্রিয় ব্যক্তিত্বের সাথে। ঘোরাঘুরি শেষে রাস্তার পাশে সাধারন মানের এক রেস্তোরাঁতে রাতের খাবারের জন্য ঢুকে পড়লাম দুজন। তারপর দীর্ঘক্ষণ নানানরকমের আলাপ চলল তাঁর সাথে। সমাজ, দর্শণ, উন্নয়ন, রাজনীতি সবই ছিল সেই আলোচনায়। একান্ত সেই আলোচনায় বাংলাদেশ এর উন্নয়নের ভবিষ্যৎ রূপরেখা কী হতে পারে সেটা নিয়ে অনেক্ষণ আলোচনা চলল।

মাঝে সুস্বাদু টুনা মাছ আর ধোঁয়া ওঠা অসাধারন বীফ স্টেকের উপর ছুরি আর কাটা চামচ এর সদ্বব্যবহার। এক পর্যায়ে প্রসঙ্গ ঘুরে এল আমার প্রতি চিরায়ত সেই প্রশ্নে – ‘নেক্সট প্ল্যান কি? বিদেশে আসবা না? উচ্চ শিক্ষার জন্য তো আসা উচিত। নাহলে তো স্ট্যান্ডার্ড লাইফস্টাইল সম্পর্কে জানবা না, আধুনিক বিশ্বে কি হচ্ছে জানবা না, দেশকে আরো ভালভাবে সার্ভ করতে হলেও তো দরকার’। আমি আমতা আমতা করে বলছিলাম দেশে এখন কাজ করার কত সুযোগ, কত কী করার আছে, এই মুহুর্তে দেশ ছেড়ে আসার মত বোকামি কি করে করি। উচ্চ শিক্ষা, উন্নত দেশের ছোঁয়া পরেও নেয়া যাবে হয়ত। উত্তর শুনে উনার প্রশ্ন ‘এই যে এত নিয়মতান্ত্রিক দেশ, এত সাজানো গোছানো জীবন যাপন – এগুলো আগ্রহ তৈরি করে না?’ আবারো আমতা আমতা করে বলছিলাম অল্প ক’দিনের ঘুরে দেখার জন্য হয়ত আগ্রহ তৈরি করে কিন্তু থেকে যাওয়ার জন্য আগ্রহ তৈরি হয় না কোন দিন। তারপর এই কথা থেকে সে কথায় রাতের খাবার শেষে আরো কিছুক্ষণ নিরুদ্দেশ ঘোরাঘুরির পর হোটেলে ফিরে এলাম।

প্রায়ই আমি এ প্রশ্নের সামনে পড়ে যাই, কিন্তু কাউকেই ঠিকভাবে বোঝাতে পারি না দেশ ছেড়ে এই দেশের বিরাট কর্মযজ্ঞের মাঝখান থেকে উড়ে অন্য কোথাও যেতে আমার কখনোই ইচ্ছা করে না। অন্য কোথাও জীবন পার করার সুখ স্বপ্ন কখনোই মনের মাঝে আসে না। এই অসহ্য গরম, জ্যাম, অনিয়ম, পেট্রোল বোমা, ইট কাঠ আর ঘামে ভেজা শহর ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা আসলেই কেমন জানি দিশেহারা হয়ে যাই আমি। আমি হয়ত একটা ইটও গাঁথতে পারি না, তারপরেও এই অসাধারন এক অভিজ্ঞতার দর্শক হওয়ার লোভে আমি প্রচণ্ড লোভী। এত প্রাণ প্রাচুর্য ছেড়ে নিস্তরঙ্গ কোন শহরে নিয়মমাফিক সুখে বিভোর হওয়াকে আমার কেন জানি অদ্ভূত এক মায়া মনে হয়, সেই মায়াতে আমি কখনোই আত্মতৃপ্তির ছায়া খুজে পাই না। সেই মায়ার পেছনে যারাই ছুটেছে তাদের কারো মুখেই আমি তৃপ্তির আবেশ দেখিনি।

আজকে একজনের অনলাইন ভিডিও দেখলাম। অন্তর্জালে খুব জনপ্রিয় ব্যক্তি, দেশকে হয়ত প্রচণ্ড ভালবাসেনও, দেশ আর দেশপ্রেম নিয়ে অনেক সৃষ্টি তার। অথচ পিএইচডি শেষ হয়ে গেলেও দেশে ফিরে আসার কোন আয়োজন নেই তার, সেই এক সুরে দেশপ্রেম বেজেই চলেছে। হয়ত অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া সুখ ছেড়ে কেউই আসতে চায় না। এই ভয়টা আমার মাঝেও কাজ করে, একবার এই দুখী দেশ ছেড়ে চলে গেলে যদি অন্য দেশের সুখে বিভোর হয়ে যাই, অভ্যস্ত হয়ে যাই তাহলে এই দুখী দেশটার দুঃখ দূর করার জন্য না হোক, দুঃখ অনুভব করার জন্য একটা মানুষ কমে যাবে… এই উপলব্ধিগুলো খুব খারাপ, এলোমেলো করে দেয় সব চিন্তাভাবনা…

Please follow and like us:
error0
fb-share-icon
Tweet 20
fb-share-icon20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *