মোটিভেশন, উৎসাহ, ইন্সপিরেশন এই শব্দগুলো বা ক্রিয়াবাচক বিশেষ্যগুলো সবই প্যাসিভ ফর্মে হয়ে থাকে। এগুলো নিয়ে মানুষের স্বচ্ছ ধারনা না থাকার কারনে কেউ কেউ বিরাট ব্যবসা ফেঁদে বসেছে।

ধরুন আমি বললাম ‘আমি আপনাকে ইন্সপায়ার (বা অনুপ্রাণিত) করি’। এই বাক্যটি ভুল। আমার কাজ বা কথা দ্বারা আপনি অনুপ্রাণিত বা প্রণোদিত হতে পারেন তবে আমি সরাসরি কথা বা কাজ দ্বারা আপনাকে অনুপ্রাণিত করতে পারি না। অনপ্রাণিত হওয়ার সুযোগ এবং এখতিয়ার কেবলই অপর পক্ষের। কেউ যখনই এটিকে ঘোষণা দিয়ে সরাসরি করার চেস্টা করবে তখন এটি প্রতারণামূলক আচরণ হিসেবে গণ্য করাই শ্রেয়।
অনুপ্রাণিত করার জন্য সবচেয়ে বেশি যেটি প্রয়োজন সেটি হলো অভিজ্ঞতা। একই সাথে জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার সংমিশ্রণ। সমস্যা হচ্ছে এই যুগে জ্ঞান আহরণ তেমন কোন বড় বিষয় নয়। তবে প্রজ্ঞা অর্জণ নিসন্দেহে দিন দিন কঠিনতর হচ্ছে। আপনি এই যুগে পঁচিশ বছরের যুবকের মুখে হয়ত খুবই হৃদয়গ্রাহী বক্তব্য শুনতে পারেন, সেটা ভাবাবেগের জন্ম দিলেও কতটা অনুপ্রাণিত করবে সেটা বলা দুস্কর। তবে সেই একই বক্তব্য প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি বর্নণা করলে তার প্রভাব ভিন্ন হবে এটাই স্বাভাবিক। এখানে অভিজ্ঞতা এবং প্রজ্ঞা একটা গভীর জীবনবোধ তৈরি করে। সাথে জ্ঞান সেই বোধকে বাস্তবতা দেয়, সাবলীল করে তোলে।
মাঝে মাঝে সমাজের অর্থনৈতিক শ্রেণীবিন্যাসে নিচের দিকে থাকা অনেক শ্রমজীবী বেশ দারুন দারুন জীবন দর্শনের কথা বলে থাকেন। কেউ কেউ সেটায় অনুপ্রাণিত হন। এখানে জ্ঞানের অনুপস্থিতি থাকলেও অভিজ্ঞতা এত প্রগাঢ় যে তা মানুষের মাঝে প্রভাব ফেলে। কিন্তু সেই একই ব্যক্তি যদি ঘোষণা দিয়ে বলে বসে ‘আমি আপনাকে অনুপ্রাণিত করি’ তখন সেটি নিসন্দেহে অর্থহীন!
আমাদের দেশে দীর্ঘদিন যাবত এই অর্বাচীন এক সংঘ মানুষকে বলে কয়ে অনুপ্রাণিত করার নামে যাচ্ছেতাই করে যাচ্ছে। এখানে মনে রাখা ভালো তারা প্রচুর ঘৃণা পেলেও এখান থেকে পিছ-পা হচ্ছে না। তার মানে মোট সংগৃহীত ঘৃণার চেয়েও তারা লোভনীয় এমন কিছু পাচ্ছে যা তাকে এই প্রতারণামূলক আচরলে প্রলুব্ধ করছে এবং একইসাথে লাভবান করছে।
সেই লাভ সামাজিক, আর্থিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যে বছরের পর বছর জমা হওয়া ঘৃণার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। তাই কেউ নিজের গরিব থেকে বড়লোক হওয়ার গল্প বেচে, কন্টেন্ট তৈরির মাধ্যমে অশ্লীলতা তৈরি করে, এরোগেন্স/হেইট/ভায়োলেন্স দেখিয়ে, শিক্ষাকে ব্যবসার পণ্য বানিয়ে, ধর্মকে পূঁজি করে কিংবা কোন কিছু ছাড়াই ইন্টারনেট থেকে গল্প সংগ্রহ করে, কমেডির নামে ভাড়ামি করে দিনের পর দিন এই প্রতারণা করে যাচ্ছে। এইসকল প্রতারণা হাজার কোটি টাকার প্রতারণার চেয়েও বড় প্রতারণা, আক্ষরিক অর্থে তো বটেই সামগ্রিক অর্থে আরো বিরাট প্রতারণা। সমাজের নীতিবোধ এবং তরুণদের বিভ্রান্ত করা মানে ভবিষ্যতে একটা বড় প্রজন্মকে নড়বড়ে করে দেয়া। এই ব্যবসা কতটা লাভজনক হলে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন প্রধান নির্বাহীরাও অবলীলায় এই পেশায় নাম লিখায়। অথচ এই দেশের নিন্মবিত্ত, মধ্যবিত্ত বা অধিকাংশ পরিবারের আগের প্রজন্মে এই গরিব থেকে অর্থনৈতিক সাবলম্বী হওয়ার গল্প আছে। প্রায় সকলেরই হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা করে অনেক কষ্ট করে ভাগ্য ফেরানোর গল্প আছে। পারিবারিক পর্যায়ে এই অনুপ্রেরণা যুগ যুগ ধরেই চলে আসছে।
শুধু যে আমাদের দেশে তা না পৃথিবীব্যাপীও অনেক এরকম বক্তার নাম মাথায় আসছে। অনেকেই হয়ত অন্য রঙ এর মানুষ একইরকম কাজ করে জনপ্রিয়তা পেয়েছে দেখে ভেবেই বসেছে এটাই হয়ত হালের নতুন চাল। আমাদের মানসিক সীমাবদ্ধতা হয়ত সে শক্তি এখনো দেয় নি যে অন্য দেশে বা পাশ্চাত্যেও কেউ প্রতারণা করতে পারে, একইভাবে জনপ্রিয় হতে পারে তাদের পেছনের গল্পটা হয়ত পুরোটাই হাওয়া। নিজের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান এবং অর্জিত প্রজ্ঞা ছাড়া যেই এই পেশায় এসেছে সেই নিসন্দেহে প্রতারণার খাতায় নাম লিখিয়েছে। স্টীভ জবসও যদি এপল, পিক্সার এর মত বড় প্রতিষ্ঠান তৈরির দীর্ঘ সংগ্রাম ছাড়া অন্যকে বলে-কয়ে অনুপ্রেরণা দিতে যেত সেটাও প্রতারণা হতো।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি অল্প বয়সেও কেউ কেউ একটা বড় সম্প্রদায়কে অনুপ্রাণিত করতে পারে। বয়স নিসন্দেহে অভিজ্ঞতার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত একটা বিষয় তবে তা একমাত্র নিয়ামক নয়। অন্য একজন মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে হলে অনেকটা গাছের মত হতে হয়, দীর্ঘকাল দাঁড়িয়ে থেকে একটা লম্বা সময়কে দেখতে হয়, ছায়াদের অনুসরণ করতে হয়। সেই সময়টা কেউ যদি দ্রুত পাড়ি দিতে পারে তখন বয়স নিতান্তই একটা সংখ্যা মাত্র।
আমি মনে-প্রাণে খুব বিশ্বাস করি অন্য মানুষকে আলোড়িত করতে হলে মানুষের জীবনকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানোর বা অভিক্ষেপ করার ক্ষমতা থাকতে হয়। এটা সবার থাকে না। জীবনের অপর পাশটা চোখের সামনে নিয়ে আসাটা এত সহজ নয়। প্রত্যেকের জীবনই ভিন্ন ভিন্ন সংগ্রাম পার করে এবং সবার জীবনই ভিন্ন। একটা বড় জনগোষ্ঠীকে অনুপ্রাণিত করতে হলে এই ভিন্ন ভিন্ন যাত্রার সাধারণ অংশটুকু খুঁজে বের করতে হয়, জোড়া লাগাতে হয় এবং তা সকলের জন্য নিজ ভাষায় প্রকাশ করতে হয়, সকলে যেন বুঝতে পারে সেই ভাষায় বলতে হয়।
হুমায়ূন আহমেদ কখনো বলে কয়ে কাউকে অনুপ্রাণিত করতে যাননি, অথচ এই শহরে এখনো কয়েক হাজার হিমু আছে, মিসির আলী আছে! হয়ত এই একটা উদাহরণই যথেষ্ট। তবে আমাদের এই প্রজন্ম একটা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মিষ্টি-মধুর প্ররোচনা থেকে বের হয়ে আসুক, টাকার চেয়ে অনুভূতির মূল্য বেশি সেটা বুঝতে শিখুক, উদ্যোক্তা হওয়ার চেয়ে উদ্যমী হওয়া প্রয়োজন, মানুষের প্রতি ভালবাসা তৈরির জন্য যাদের সংস্পর্শ প্রয়োজন তাদের সন্নিকটে আসুক। খুব জরুরি এই চাওয়াটা, এখন কোন সামাজিক কাজে স্বেচ্ছাসেবী পাওয়া বেশ দুস্কর, এক দশক পর দেশকে ভালবাসার জন্য মানুষ পাওয়া দুস্কর হয়ে গেলে অনেক কিছুই অর্থহীন হয়ে যাবে। সেই দুঃসময়টা দেখতে চাই না।
#প্রজন্ম #অনুপ্রেরণা #প্রতারণা